বিবাহ ও তালাক

নারীরা নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন কি?

নারীরা নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন কি? সম্প্রতি হাইকোর্টের প্রকাশিত একটা রায়ের পরে উপর্যুক্ত বিষয় নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। তারই প্রেক্ষিতে আজকের এই লেখা। তবে, আদালত কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের সমালোচনা বা বিশ্লেষণ কিংবা ব্যাখ্যা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।
সাধারণভাবে, ‘বাংলাদেশে নারীরা নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন কিনা?’ এই বিষয়টা আলোচনা করাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

নারীরা নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন কি?

প্রথমেই যে বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া দরকার তা হচ্ছে- বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ কোন আইনে হবে? মুসলিম শরীয়াহ আইনে নাকি অন্য কোন সাধারণ আইনে?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় The Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937 এর প্রস্তাবনা এবং ২ ধারায়।
এই আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে- ‘WHEREAS it is expedient to make provision for the application of the Muslim Personal Law (Shariat) to Muslims in Bangladesh.’
এবং ধারা-২ এ বলা হয়েছে যে, (ক) উত্তরাধিকার, (খ) বিবাহ, (গ) তালাক, (ঘ) ভরণপোষণ, (ঙ) দেনমোহর, (চ) অভিভাবকত্ব, (ছ) দান, (জ) ট্রাস্ট ও ট্রাস্ট সম্পত্তি এবং (ঝ) ওয়াকফ এই বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে মুসলিম শরীয়াহ আইন প্রযোজ্য হবে।
তাহলে এটা এখন স্পষ্ট যে, মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে মুসলিম শরীয়াহ আইন পুরোপুরিভাবে কার্যকর হবে।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে শরীয়াহ আইনের কোন বিধান যদি বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে কি শরীয়াহ আইন বাতিল হবে?
এটার সরাসরি উত্তর আমার জানা নাই বা কোথাও পাই নাই। তবে সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমঅধিকার লাভ করবে বলা হলেও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমান সম্পত্তি পায় না। কারণ বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইন প্রযোজ্য হয়। অর্থাৎ সংবিধানের বিধানের সাথে শরীয়াহ আইন সাংঘর্ষিক হলেও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইনের বিধানই প্রযোজ্য হচ্ছে। বিবাহের ক্ষেত্রেও এমনটাই হবে বলে মনে হচ্ছে।
এবার সরাসরি ‘নারীরা নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন কিনা?’ এই প্রশ্নের আলোচনায় আসা যাক।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর বিধি-৮ এ নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে-
i) আলীম সার্টিফিকেটধারী;
ii) সর্বনিম্ন ২১ এবং সর্বোচ্চ ৪০ বছর বয়স্ক; এবং
iii) সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা
এমন ব্যক্তি নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন।
এই বিধির বিধানবলে নারী ও পুরুষ উভয়ই নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে।
তাহলে এবার আসা যাক The Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 এ।
এই আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে-
ক) যখন নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজেই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন তখন বিবাহ তাৎক্ষণিক রেজিস্ট্রেশন করবেন।
খ) যখন নিকাহ রেজিস্ট্রার ব্যতীত অন্য ব্যক্তি বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন তখন বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বর/পাত্রপক্ষ নিকাহ রেজিস্ট্রেশনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিকট প্রতিবেদন দিবেন।
গ) প্রতিবেদন পাওয়ার পরে নিকাহ রেজিস্ট্রার তাৎক্ষণিক নিকাহ রেজিস্ট্রেশন করবেন।
এই ধারা বিশ্লেষণ করলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, নিকাহ রেজিস্ট্রার বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা নিজে সম্পন্ন করুন বা না করুন তাকে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে।
বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা কারা সম্পন্ন করতে পারবেন এটা সম্পূর্ণরূপে ইসলামী শরীয়াহ এর প্রশ্ন। ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুধু যোগ্যতাসম্পন্ন পুরুষেরা সম্পন্ন করতে পারবেন। কোন নারী বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের যোগ্য হবেন না।
এই বিষয়ে বিশদ ধারণার জন্য নিচের আর্টিকেলটা উল্লেখযোগ্য-
অতএব, ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারকে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের যোগ্য হতে হবে অর্থাৎ পুরুষ হতে হবে। এটাই নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হওয়ার প্রথম ও প্রাথমিক যোগ্যতা।
১৯৭৪ সালের এই আইনের ১৪ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ প্রণয়ন করে এবং এই বিধিমালার বিধি ৮ এ নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্যতা নির্ধারণ করে।
তাই নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের যোগ্যতা নিরূপণের জন্য ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন এবং ২০০৯ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা একত্রে পড়তে হবে। এই দুই আইনের বিধান অনুযায়ী একজন নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের যোগ্যতা হবে নিম্নরূপঃ
ক) বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের যোগতা সম্পন্ন পুরুষ ব্যক্তি;
খ) বাংলাদেশের কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা বোর্ড হতে আলীম সার্টিফিকেটধারী;
গ) সর্বনিম্ন ২১ বছর এবং সর্বোচ্চ ৪০ বছর বয়স্ক ব্যক্তি; এবং
ঘ) সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা।
পরিশেষে, কোন নারী নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না। এমনকি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড হতে এইচএসসি সার্টিফিকেটধারী বা এইচএসসি সার্টিফিকেটধারী কোন ব্যক্তি কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে সাধারণ বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেও নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না। সাধারণভাবে চিন্তা করলে নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার হওয়ার বিশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতাও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হবে। কিন্তু মাদ্রাসায় ইসলাম, ইসলামী শরীয়াহের পাশাপাশি সাধারণ বিষয়ে পাঠ দেয়া হয়, সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে সাধারণ বিষয়সমূহের পাশাপাশি ইসলাম শিক্ষার পাঠ দেয়া হয়। তাই ইসলামী শরীয়াহের জ্ঞানের ব্যাপারে সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের চেয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে আছেন বা থাকবেন।
  • সুমন হোসেন
  • Studied Master of Laws (LL.M.)
  • Department of Law, University of Rajshahi

আইন ব্যবসায়ী

আইনজীবী হলেন 'আইন ব্যবসায়ী', যিনি একজন এ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার, এটর্নি, সলিসিটর বা আইনি উপদেশক। আইনজীবী মূলত আইনের তাত্ত্বিক বিষয়গুলির বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তির বা সংস্থার আইনি সমস্যার সমাধানের কাজ করে থাকেন।

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button